• ১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ভাবনা

ডেস্ক
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৩, ০৪:৫২ পূর্বাহ্ণ
জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ভাবনা
সংবাদটি শেয়ার করুন....

অধ্যাপক মো: ইউনুস আলী সিদ্দিকী

একসাগর রক্তের বিনিময়ে আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ট নেতৃত্বে অর্জিত স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর আমরা পার করছি। সাধারণত স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি দেশের প্রধান কাজ হচ্ছে জাতি তৈরি (Nation Building ) এর কাজে গভীর মনযোগ দেয়া। এই জাতি তৈরির জন্য তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার দুই ধরণের উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। একটি হচ্ছে স্ট্রাকচারাল বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন: রাস্তাঘাট, ব্রীজ-কালভার্ট, বিমানবন্দর ইত্যাদি দৃশ্যমান স্থাপনাসমূহ। অন্যটি হচ্ছে সুপারস্ট্রাকচারাল বা উপরিকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন: সংস্কৃতি, জাতীয় চেতনা, শিক্ষা ব্যবস্থা, আইনগত কাঠামো ও উপযুক্ত রাজনৈতিক-সামাজিক দর্শন ইত্যাদি তৈরি করে স্থায়ী রূপদান করা। স্ট্রাকচারাল উন্নয়নমূলক কার্যক্রমগুলো আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান। এগুলোর আর্থিক ও রাজনৈতিক ফলাফল অল্প সময়ের মধ্যে জাতি ভোগ করতে পারে। অন্যদিকে সুপারস্ট্রকচারাল উন্নয়ন কার্যক্রমগুলো দৃশ্যমান না হলেও স্ট্রাকচারাল উন্নয়নের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর আর্থিক ও রাজনৈতিক সুফল স্বল্প সময়ের মধ্যে জাতি ভোগ করতে পারে না। ভোটের রাজনীতির মাঠে এগুলোর ব্যবহারও সহজে করা যায় না। স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতার পরপরই দুই ধরণের উন্নয়নমূলক কাজে পরিপূর্ণ মনোনিবেশ করলেও সুপারস্ট্রাকচারাল উন্নয়নে বেশি মনযোগী ছিলেন। অন্যান্য সবগুলো ক্ষেত্রের মধ্যে তিনি শিক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। স্ট্রাকচারাল ও সুপারস্ট্রাকচারাল উন্নয়নের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার চেষ্টায় থাকাকালীন মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাকে স্বপরিবারে আমরা হারিয়ে ফেলি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের কাজ এখন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তারই সুযোগ্য তনয়া বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্বে উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে আমরা দ্রুতবেগে এগিয়ে চলছি। সর্বক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন ও অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প এবং মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা বদলে যাওয়া বাংলাদেশ পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর ন্যায় তিনিও শিক্ষাকে সকল উন্নয়নের মেরুদন্ড হিসেবে নিয়েছিলেন। পরবর্তী প্রজন্ম নিশ্চয়ই এর সুফল ভোগ করবে। একটি সুপারস্ট্রাকচারাল সেক্টর হিসেবে সঠিকভাবে জাতি গঠনের জন্য এবং দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় সুফল পাওয়ার জন্য অন্যান্য খাতের তুলনায় শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। জাতীয় বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দের পরিমাণ দেখলে শিক্ষায় বিনিয়োগের প্রকৃত চিত্র বুঝা যায়।

দেশে-বিদেশে সকল ধরণের মিডিয়ায় বাংলাদেশের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য অনুমোদিত বাজেট সম্পর্কিত আলোচনা কিছুটা পুরাতন হয়েছে। সার্বিক দিক দিয়ে উন্নত দেশসমূহে বাজেট নিয়ে সাধারণত তেমন কোন হইচই না হলেও বার্ষিক মুদ্রানীতি নিয়ে সবথেকে বেশি আলোচনা হয়। আমাদের দেশে মুদ্রানীতি নিয়ে তেমন কথা না হলেও বাজেট নিয়ে বেশ আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। সাধারণত আমরা জানি, উত্থাপিত বাজেট একবার পাশ হয়ে গেলে পরবর্তীতে সম্পুরক বাজেট ছাড়া তেমন কোন পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয় না। তাই আমাদের উচিত হবে পাশকৃত বাজেট নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ না করে পরবর্তী অর্থ বছরের বাজেটে যেন কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ পাওয়া যায় সেজন্য আগে থেকেই বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করা। এ বিষয়টিকে বেশি জরুরি মনে করেই আমার আজকের তুলনামূলক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধটি লিখছি।

অর্থ বছরের বাজেটের অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর যাবতীয় আলোচনা শেষ হওয়ার পরই মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন পুরোদমে শুরু হতে থাকে। বাজেটের বাস্তবায়ন এক অর্থবছরব্যাপী চলতে থাকলেও জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদে একটা প্রভাব পড়ে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের পাক্কলিত জিডিপি ধরা হয়েছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা। এই বাজেটটি মোট জিডিপির ১৫.২১ শতাংশ তথা ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। এই বিশাল বাজেটে শিক্ষায় (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, কারিগরি ও মাদ্রসা শিক্ষা ও আইসিটি শিক্ষা) ৮৮ হাজার ১৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিলো ৮১ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা; অর্থাৎ নতুন বাজেটে টাকার অংকে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ছে ৬ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। তুলনামূলক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, কারিগরি ও মাদ্রসা শিক্ষায় খাতভিত্তিক বরাদ্দ সেই অর্থে বাড়নি। একটি দেশের মোট জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ বা বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করার জন্য ইউনেস্কোর পরামর্শ থাকলেও এবছর শিক্ষায় বাজেট ধরা হলো জিডিপির ০১.৭৬ শতাংশ। গেল বছর অর্থাৎ ২২-২৩ অর্থবছরে যা ছিলো ০১.৮৩ শতাংশ। এর আগে যা ০২.০৮ শতাংশ ছিলো। এ বছরের মোট বাজেট গত বছরের বাজেটের তুলনায় ১২.৩৪ শতাংশ বড় হলেও শিক্ষায় বরাদ্দ করা হয়েছে জাতীয় বাজেটের ১১.৫৭ শতাংশ, গেল বছরে যা ছিলো ১২.০১ শতাংশ। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষায় শতকরা হারে ০.৪৩ শতাংশ কমলেও টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বেড়েছে। ইউনেস্কোর রিপোর্টে দেখা যায় যে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জিডিপির শতাংশ হিসেবে বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে গড় ব্যয় ছিলো ৪১টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে নিম্নদিক দিয়ে ৫ম। দুঃখের বিষয় হলো এবারের বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে এবং দেশের ১৫ বছরের বাজেট হিসাবেও সর্বনিম্ন। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, অন্য যেকোন খাতের তুলনায় শিক্ষা খাতের গুরুত্ব খুব একটা বাড়েনি। দেশের শিক্ষা বিশেষজ্ঞগণ শিক্ষা খাতকে মেগা প্রকল্প হিসেবে নিয়ে অগ্রাধিকার দেয়ার পরামর্শও দিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে মনে করেন, সরকার ইতোমধ্যে গৃহীত মেগা প্রজেক্টে বেশি বরাদ্দ দিবে বা করোনা অতিমারির ক্ষতি পোষাতে বিশেষ উদ্যোগসমূহে অর্থ ব্যয় করতে হবে তাই হয়তো শিক্ষায় বরাদ্দ সংকোচন নীতি নিয়েছে। শিক্ষা যেহেতু একটি সুপারস্ট্রাকচারাল উন্নয়ন খাত সেহেতু এখান থেকে স্বল্প মেয়াদী সুফল বা আর্থিক প্রাপ্তি আশা করাটা জাতির জন্য অলাভজনক হবে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে চাইলে শিক্ষাকে জাতির মেরুদন্ড করে তুলতে হবে এবং এটাকেই সবোর্চ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত ও সামগ্রিক উন্নয়নের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে নিতে হবে।
শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যার সুবিধা। আধুনিক বিশ্বে যেকোন দেশের জনসংখ্যাই সেদেশের প্রধানতম সম্পদ। আর কোন দেশে যখন অর্ধেকের বেশি মানুষ ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ও কর্মক্ষম থাকে এবং নির্ভরশীল মানুষ অনেক কম থাকে তখন বলা হয়ে থাকে, সেদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর মধ্যে আছে। আমদের দেশে আয়তনে তুলনায় জনসংখ্যাধিক্য থাকলেও আমরা মূলত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর মধ্যেই আছি এবং এটা ২০৫০ সাল নাগাদ শেষ হয়ে যাবে। আর একটি দেশে এই সুযোগটা একবারই আসে। সুতরাং আমরা জনসংখ্যাগত চমৎকার একটা সুবিধাজনক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। পৃথিবীর সবগুলো উন্নত দেশ তাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর সদ্য ব্যবহার করতে পেরেছে বলেই উন্নতির চরম শিখরে পৌছতে পেরেছে। আর এই সুযোগ যারা সদ্য ব্যবহার করতে না পারবে তারা নয়া-বিশ্ব ব্যবস্থায় মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে পারবে না। এখন উন্নত দেশসমূহের জনসংখ্যা অপ্রতুল হলেও বাইরের দেশ থেকে সস্তায় শ্রমিক বা প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি আমদানী করে চলতে পারছে। আমরা যদি এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর সদ্য ব্যবহার করতে না পারি তাহলে এসডিজি, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশে গড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে এবং পরবরর্তী প্রজন্মকে আজীবন এর খেসারত দিতে হবে, যেমনটা দিচ্ছে পৃথিবীর অনেকগুলো দেশ।

সুপারস্ট্রাকচারাল উন্নয়ন এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর সুফল পাওয়ার জন্য আমাদের অন্যতম প্রধান পঁূজি হচ্ছে শিক্ষা। দেশের বিদ্যমান মানবসম্পদকে উপযুক্ত ও বান্তবসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তর, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জনগণকে উপযুক্ত দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে তোলাই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ। এজন্য অবশ্যই শিক্ষাকে দ্রুত ঢেলে সাজাতে হবে যার জন্য প্রয়োজন বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ আরো বৃদ্ধি করা। এবারের বাজেটে যে পরিমাণ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে সেটি তুলনামূলকভাবে পর্যাপ্ত নয় বলে শিক্ষাবিদগণ অভিমত দিচ্ছেন। দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিয়ে শিক্ষায় জোর না দিলে আমরা যেমনি পরনির্ভরশীলই থেকে যাব তেমনি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারেও পিছিয়ে থাকবো। আমাদের মনে রাখা উচিত যে, ১০০ বছর পর মেগা প্রজেক্টগুলো নিশ্চিতভাবে ভেঙ্গে ফেলতে হবে অথবা অনুপযোগী হয়ে যাবে কিন্তু ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড যেহেতু আর আসবে না সেহেতু এর সদ্য ব্যবহার না করতে পারলে মেগা প্রজেক্টও আর তৈরি করতে পারবো না পরনির্ভরশীলতাও কমবে না। তখন শিক্ষায় বেশি বরাদ্দ বাড়িয়েও লাভ হবে না। বঙ্গবন্ধুর সময়ে জাতীয় বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দিতেন। তাঁর স্বপ্ন ছিলো দেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তর করতে হলে শিক্ষাখাতকে সবথেকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ালে শিক্ষার সামগ্রিক মান বাড়বে। ২০৪১ সালের উন্নত সমৃদ্ধ স্মার্টর্ বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করতে হলে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। আমরা বিশ্বাস করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অন্যান্য অবকাঠামো খাত এর তুলনায় শিক্ষা খাত অনেক বেশি অগ্রাধিকার পাবে। আমাদের শিক্ষা খাতকে প্রকৃতার্থে জাতির মেরুদন্ড হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারলে চলমান ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর সদ্যব্যবহার করা সম্ভব হবে।

*লেখক: অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও অধ্যক্ষ, ঝালকাঠি সরকারি কলেজ, ঝালকাঠি।