• ১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কখন, কেন প্লাটিলেট নিতে হয় ডেঙ্গু রোগীর?

ডেস্ক
প্রকাশিত জুলাই ১১, ২০২৩, ০৪:৫০ পূর্বাহ্ণ
কখন, কেন প্লাটিলেট নিতে হয় ডেঙ্গু রোগীর?
সংবাদটি শেয়ার করুন....

করোনাভারাসের মতো ‘মহামারি’ আকার ধারণ করেছে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মশাবাহিত এই রোগটিতে আক্রান্তের সংখ্যা। এই রোগে আক্রান্ত হলে রোগীর শরীরে প্লাটিলেটের মাত্রা কমে যায়। দেখা দেয় রক্তের প্রয়োজনীয়তা।

প্লাটিলেট কী?
মানুষের রক্তে তিন ধরনের ক্ষুদ্র রক্তকণিকা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট রক্তকণিকাই হলো প্লাটিলেট। বাংলায় এটিকে বলা হয় অণুচক্রিকা। আর প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা উৎপাদন হয় অস্থিমজ্জায়। এটি রক্ত জমাট বাঁধতে ও রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সাহায্য করে।

একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরের প্রতি মাইক্রোলিটার রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা দেড় লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখ পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্লাটিলেটের মাত্রা এর চাইতে কমে গেলে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না। ফলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি দেখা দেয়। আর রক্তে প্লাটিলেট কমতে শুরু করাকে চিকিৎসা শাস্ত্রে বলা হয় থ্রোম্বোসাইটোপেনিয়া।

প্লাটিলেট কমা কেন বিপজ্জনক?
শুধু ডেঙ্গু নয়, অন্যান্য রোগের কারণেও প্লাটিলেট কমতে পারে। তবে প্লাটিলেট ১ লাখের নিচে নেমে গেলে তাকে জটিল পরিস্থিতি বলে ধরে নেওয়া যায়।

ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে কর্মরত। ডেঙ্গু রোগীদের সতর্ক করে এই চিকিৎসক বলেন, প্লাটিলেটের সংখ্যা ২০ হাজারের নিচে নামলে কোনো আঘাত ছাড়াই রক্তক্ষরণ হতে পারে। এই সংখ্যা ১০ হাজারের নিচে নামা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় শরীরের যেকোনো জায়গা থেকে অনবরত রক্তপাত হওয়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকি থাকে।

প্লাটিলেট কমলেই রক্ত নিতে হয়?
অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক তিনি। বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক জানিয়েছেন, প্লাটিলেট কমে গেলেই যে রক্ত নিতে হবে বিষয়টি এমন নয়। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে প্লাটিলেট কমে যাওয়া একমাত্র সমস্যা নয়। এই রোগে আক্রান্ত হলে শরীরের রক্তরস কমে যায়, রক্তচাপ কমে— এটিও পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে। সেক্ষেত্রে লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিলে রোগীকে সারিয়ে তোলা সম্ভব। এতে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে।

তিনি বলেন, বেশিরভাগ ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে প্লাটিলেট দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। রক্তে প্লাটিলেট কমে খুব কম সময়ের জন্য— হয়তো দু’তিন দিন। এরপর নিজে থেকেই প্লাটিলেট বাড়তে থাকে। তাই আমরা ঢালাওভাবে রক্ত নেওয়ার পরামর্শ দেই না।

অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ, আমাদের এমন রোগীও আছে যে প্লাটিলেট ১০ হাজারে নেমেছে, তাও রক্ত লাগেনি। রোগী ভালো হয়ে গিয়েছেন। তবে যদি রোগীর রক্তক্ষরণ বেশি হয়, রক্তরস, হিমোগ্লোবিন ও প্রেশার কমে যায়— তাহলেই রক্ত দেওয়ার কথা বলি।

ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ বলেন, অনেক সময় প্লাটিলেটের সংখ্যা বেশি থাকলেও এর কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় রোগীর অবস্থার অবনতি হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়লে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

তারমতে— ডেঙ্গুজ্বর নির্ণয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা আছে। তবে এনএসওয়ান নামে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু হয়েছে কি না দ্রুত বুঝা যায়। জ্বর হওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে এই পরীক্ষাটি করানো প্রয়োজন। রক্তের সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) পরীক্ষার মাধ্যমে প্লাটিলেট নিরূপণ করা যায়। পরীক্ষায় প্লাটিলেট কম এলেই যে রোগীকে প্লাটিলেট দিতে হবে- বিষয়টি এমন নয়।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, চিকিৎসকরা রোগীর বয়স, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বুঝেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। সাধারণত ১ ইউনিট প্লাটিলেটের জন্য চারজন দাতার রক্ত নিতে হয়। ১ ইউনিট প্লাটিলেট দিলে ২০ হাজার কাউন্ট প্লাটিলেট বাড়তে পারে।

তারা আরও জানিয়েছেন, প্লাটিলেট সঞ্চালন বেশ ব্যয়বহুল ও জটিল পদ্ধতি। তাই সব হাসপাতালে রক্ত থেকে প্লাটিলেট পৃথক করার যন্ত্রও নেই। এ কারণে ঘরে ডেঙ্গু রোগী থাকলে আগে থেকেই আশপাশের কোন হাসপাতালে প্লাটিলেট সঞ্চালনের ব্যবস্থা আছে সে বিষয়ে খোঁজ রাখতে হবে। সাধারণত ডেঙ্গু জ্বর জটিল রূপ নিলে বা রক্তক্ষরণ দেখা দিলে সেটাকে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বলা হয়। রোগটি এই পর্যায়ে এলে রক্ত নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে— ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য থাকে। তার মধ্যে, প্লাটিলেট ১ লাখের নিচে থাকবে, রক্তের হেমাটোক্রিট বা পিসিভি অর্থাৎ প্যাকড সেল ভলিউম বেড়ে যাবে, রক্তনালী থেকে রক্তরস বেরিয়ে আসার সমস্যা দেখা দেবে।

কখন রক্ত নিতে হয়?
হেমোরেজিক ফিভার পর্যায়ে মূলত রোগীর রক্তনালীগুলোর দেয়ালে যে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে, সেগুলো বড় হয়ে যায়। এতে রক্তনালীর দেয়াল ভেদ করে রক্তের জলীয় উপাদান বা রক্তরস নালীর বাইরে বের হয়ে আসে। এটিকে প্লাজমা লিকিংও বলা হয়। এতে রোগীর পেটে–বুকে পানি জমতে পারে। একই সঙ্গে রোগীর রক্তচাপ কমতে থাকে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ জানিয়েছেন, প্লাটিলেট কমার চাইতে, রক্তচাপ কমে যাওয়া ডেঙ্গু রোগীর জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। প্লাটিলেট কমাসহ আরও কয়েকটি কারণে রোগীর মস্তিষ্ক, কিডনি, হৃদপিণ্ডেও রক্তক্ষরণের আশঙ্কা থাকে। এমনকি হেমারেজিক শকের কারণে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, অ্যাক্টিভ ব্লিডিং ও প্লাটিলেট ২০ হাজারের নিচে নামতে দেখলে রোগীর পরিস্থিতি বুঝে আমরা রক্ত নেওয়ার পরামর্শ দেই। তবে প্লাটিলেট কমে যাওয়া ডেঙ্গু রোগীর একমাত্র সমস্যা নয়। আশঙ্কার বিষয় হলো রোগীর রক্তচাপ কমে যাওয়া। কারণ প্রেশার কমে গেলে শরীরে অক্সিজেনের অভাব হয়। এতে বিভিন্ন অঙ্গ সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তারমতে— এসব জটিলতার পাশাপাশি যদি রোগীর রক্তচাপ অনেক কমে যায়, হৃদস্পন্দন বাড়ে, হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কমে যায়, অন্যান্য জটিলতা দেখা, তবেই রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

যেসব লক্ষণ দেখলে রক্ত নিতে বলেন চিকিৎসকরা-

প্লাটিলেট কমে যাওয়া।
ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ। ত্বকে বেগুনি রঙের ক্ষত দেখা দেবে।
শরীরে লাল বা কালো র‍্যাশ দেখা দেয়।
মাসিকে অতিরিক্ত রক্তপাত হওয়া।
মুখ, মাড়ি বা নাক থেকে রক্তপাত হতে পারে।
প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে রক্তপাত। কালো রঙের নরম পায়খানা হওয়া।
ক্ষতস্থান থেকে বা কোথাও কাটলে অনেকক্ষণ ধরে রক্তপাত হওয়া।
অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ ও শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়।
কী খেলে প্লাটিলেট বাড়ে?
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন— ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুষম খাবারের পাশাপাশি তরল জাতীয় খাবার খাওয়ানো উচিত। রোগীকে যেসব খাবার খাওয়ালে কমে যাওয়া প্লাটিলেট আগের অবস্থায় ফিরে আসবে—

মিষ্টি কুমড়া ও এর বীজে থাকা ভিটামিন ‘এ’ রক্তে প্লাটিলেট তৈরিতে সাহায্যে করে। তাই ডেঙ্গু রোগীর রক্তে প্লাটিলেট কমে গেলে মিষ্টি কুমড়া খেতে পারে।
লেবুর রসে থাকা প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ বাড়ায়। এছাড়া শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়। তাই ডেঙ্গু রোগীকে প্রচুর লেবু শরবত খাওয়ানো উচিত।
আমলকীতেও রয়েছে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। আমলকী খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং প্লাটিলেট ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে।
রক্তের যেকোনো সংক্রমণ দূর করতেও অ্যালোভেরা খুবই উপকারী। নিয়মিত অ্যালোভেরার জুস পান করলে রক্তের প্লাটিলেট বাড়ে।
ডালিমে প্রচুর আয়রন রয়েছে। যা রক্তে প্লাটিলেট বাড়াতে এবং শরীরের দুর্বলতা দূর করতে খুবই ভালো কাজ করে। তাই রোগীর রক্তে প্লাটিলেট বাড়াতে তাকে নিয়মিত ডালিমের জুস খেতে দিন।
এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজি মালয়েশিয়ার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে— পেঁপে পাতার রস এবং পাকা পেঁপের জুস ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর রক্তে কমে যাওয়ার প্লাটিলেটের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
সবুজ শাকসবজি, ভিটামিন সি যুক্ত ফল বা তাজা ফলের রস, সেইসাথে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, প্রোটিন, ভিটামিন কে, ই সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এক্ষেত্রে প্যাকেটজাত খাবার এবং অতিরিক্ত মসলাদার খাবার এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।