ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর সাম্প্রতিক হামলা ও কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনা

প্রকাশ: 8 May, 2020 3:08 : PM

এ কে এম ইফতেখারুল ইসলাম
সহযোগী অধ্যাপক
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইদানীং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাবি শিক্ষার্থীদের উপর হিংসাত্মক ঘটনার খবর আসছে। এসব ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের কোন শিক্ষার্থী যেন বিনা কারনে হেনস্থার শিকার না হয়। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি ঢাবির শিক্ষার্থীরা সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন জায়গায় সহসাই বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে কেন? আমার ধারনা হল ব্র্যান্ড হিসেবে ঢাবির সুনাম নষ্ট হয়েছে তাই। ৮০/৯০ দশকে ঢাবির শিক্ষার্থী নাম শুনলেই মানুষ সমাজে তাকে আলাদা সম্মানজনক স্থান দিত। আজ কী অবস্থা তা আপনারা নিজেরাই জানেন। এই ব্র্যান্ড নষ্ট করল কে/কারা? উত্তরঃ আমরাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি বৃহৎ পরিবার। এখানে সুখ -দুঃখ, হাসি -কান্না সবই আছে। এই পরিবারের ধারণা আছে বলেই আজ যখন দেশের এক প্রান্তে আমাদের কোন ভাই বিপদগ্রস্ত হয় তখন তাকে সাহায্যের জন্যে ঝাপিয়ে পড়ি। প্রাক্তন কারও ঢাবি ব্যাকগ্রাউন্ড শুনলে নির্দ্বিধায় ভাই সম্বোধন থেকে শুরু করে অন্য ধরনের সখ্যতা গড়ে তুলি। পরিবারের অভিভাবক বা কোন সদস্যের কোন বিচ্যুতি (ভুল বলব না) কি আমরা রাস্তাঘাটে বা বাজারে গিয়ে আলোচনা করি? কথায় কথায় তার দুর্বলতার জায়গাগুলো নিয়ে খোটা দেই? আজ একজন অন্য কোন কলেজ /বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্র/ছাত্রী যদি আপনার সামনে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকের কোন মানবীয় দুর্বলতা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে তাহলে কি আপনি ভালোলাগা অনুভব করবেন? নিশ্চয়ই নয়। কারন আপনিও এই পরিবারের একজন। কিন্তু ফার্স্ট প্লেসে এই ঠাট্টার সুযোগটা কিন্তু আমরাই তাদের দিয়েছি। ইদানিং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরাও আমাদের নিয়ে ট্রল করে! অধ্যাপক আখতারুজ্জামান স্যার ঢাবির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে তাকে ঘিরে বিভিন্ন মহলের নানান নেতিবাচক প্রচারণা শুরু হল। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরাও এতে যোগ দিয়ে তার ভাষাগত দুর্বলতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল করা শুরু করলাম। দেখা গেল,ভাল একটি নিউজে বা ইতিবাচক একটি মন্তব্যেও মাত্রাতিরিক্ত দৃষ্টিকটু ট্রল হতে লাগল। এমনকি ইতিহাসে প্রথমবারের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসায় নারকীয় ও ধ্বংসাত্মক হামলা হল। তার পরিবারের সদস্যরা একটি প্রায় গোপনীয় ও অন্ধকার কক্ষে পালিয়ে বেচে ছিলেন। কয়েক ঘন্টা ধরে স্যার তার পরিবারের খোজ পাননি। আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল তার ব্যবহৃত গাড়ি ও বাসার শতবর্ষী আসবাবপত্রসহ স্যুভেনির আইটেমে। স্যার বলেছিলেন “আমার ছাত্ররা এটা করতে পারে না” ঠান্ডা মাথায় একবার ভাবুনতো! আমাদের প্রতি তার বিশ্বাসের মাত্রাটি দেখুন। চিন্তা করে দেখুন, আপনার – আমার ঘরে আগুন ধরিয়ে দিলে আমাদের মনের অবস্থা কি হত! এমনকি আমরা ভিসি প্যানেল থেকে শুরুকরে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তেও অযাচিত মন্তব্য করেছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতার কথা আমরা জানি। তারপরও জধহশরহম নিয়ে হা-হুতাশ করে আপামর জনসাধারনের মধ্যে নেতিবাচক ধারনার সৃষ্টি করেছি। একটা পরিবারের মধ্যে অনেক দুর্বলতা থাকে, তা আমরা কাউকে ঢোল পিটিয়ে জানাই না। বাবা-ছেলে, ভাই-ভাই, ভাই-বোন, বোন-বোন ঝগড়া করলেও ঘরের মধ্যে আওয়াজ উচুকরিনা পাছে পাশের বাড়ির মানুষ জেনে যায়। সেখানে আমরা নিজেরাই এই পরিবারের ধারণাকে গলা টিপে হত্যা করছি। তাই ভবিষ্যতে আমরা সকলের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করি। সর্বোপরি,আমরা তখনই সম্মান পাব যখন আমরা নিজেদের সম্মান করতে শিখব। সম্মান করুন সম্মান নিন। এটাই অমোঘ নীতি।